নিবন্ধ – বিশ্ব হিউম্যানিটেরিয়ান শীর্ষ সম্মেলন ২০১৬: অংশীদারিত্বমূলক মানবতার একটি কার্যসূচী – রবার্ট ডি.ওয়াটকিন্স, জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারী – বাংলাদেশ

WHSUNRC Photo.small sizeঢাকা, ২১ মে শনিবার ২০১৬: সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের আবির্ভাব এবং ভূমধ্যসাগরের অববাহিকায় অভিবাসীদের মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক  ঘটনার মধ্য দিয়ে আজ আমরা একটি বিষয় প্রত্যক্ষভাবে অনুধাবন  করছি আর তা হলো মানবিক সংকট উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । বর্তমানে অন্তত ১২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের জন্য  মানবিক সহায়তা প্রয়োজন । এদের মধ্যে ৬ কোটি মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই  বাস্তুহারা মানুষের সর্ববৃহৎ উপস্থাপন । এই ক্রমবর্ধমান সঙ্কট বিশ্বের বহু স্থান জুড়ে ঘটছে, কিন্তু এটি বিশেষ করে ৩৭ টি দেশের মধ্যে তীব্রভাবে দেখা যাচ্ছে ।

মানবতামূলক কার্যক্রম ক্রমশ জটিল এবং চারিত্রিকভাবে বহুধরনের হয়ে উঠছে ।  আবার একই সময়, সংস্থান সংগ্রহের মাধ্যম ক্রমশ দুর্লভ হয়ে আসছে কারন এই সঙ্কট মোকাবেলার জন্য দাতা দেশগুলো তাদের সীমিত জাতীয় মানবিক এবং উন্নয়ন বাজেটের সমুদয় সাহায্য অর্পণ করছে ।  সংঘাত এবং দুর্যোগ আক্রান্ত লক্ষ লক্ষ জনসাধারনকে কার্যকর ও দক্ষ মানবিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে গত বছর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন বিশ্বব্যাপী সমন্বিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম গ্রহনের আহবান জানান ।  এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য  তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে নতুন ভাবে যৌথ প্রচেষ্টা উপস্থাপনের জন্য বিশ্বের নেতারা ২৩-২৪ মে ইস্তাম্বুলে প্রথমবারের মত বিশ্ব হিউম্যানিটেরিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে একত্রিত হবেন । এই সামিটটি  বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সকল দেশের দৃষ্টিকোণ এবং প্রস্তাব উপস্থাপন করার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে ।

একই সময়ে, জাতিসংঘ মহাসচিব একটি “মানবতার জন্য এজেন্ডা” উপস্থাপন করবেন এবং পাঁচটি মূল দায়িত্বে অঙ্গীকারবদ্ধ্য হবার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাবেন :
যেহেতু ৮০ শতাংশ মানিবিক চাহিদাগুলো তৈরী হয় সংঘাতের কারণে, প্রথম মূল দায়িত্ব হলো বিশ্ব নেতৃত্বদানকারীদের রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সংঘাত প্রতিরোধ এবং অবসান করতে হবে ।
দ্বিতীয় মূল দায়িত্ব হলো সবাইকে একটি আদর্শ পক্ষাবলম্বন করতে হবে যা মানবতা রক্ষা করবে কেননা  ৯০ শতাংশ মানুষ যারা যুদ্ধে  ইচ্ছাকৃত বা নির্বিচার হামলায় মৃত্যুবরণ করেন বা আহত হন তারা বেসামরিক নাগরিক  ।
তৃতীয় মূল দায়িত্ব অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে “কাউকে পেছনে ফেলে রাখা হবে না” – সবার প্রতি এই আহবান করে যেখানে নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা, অভিবাসী, উদ্বাস্তু, সংখ্যালঘু, দরিদ্র, বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী সবাই উন্নয়নে অন্তর্ভূক্ত থাকবে ।
চতুর্থ মূল দায়িত্ব শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং  রূপান্তরযোগ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে অরক্ষিত অবস্থা ও ঝুঁকি হ্রাস করে  মানুষের জীবন পরিবর্তনের আহবান জানায় – সেটা ত্রান বিতরণ হতে শুরু করে ত্রান সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা সমাপ্তির সন্ধানের মাধ্যমে সম্ভব ।
পঞ্চম মূল দায়িত্ব মানবতার জন্য আমাদের অংশীদারী দায়িত্ববোধ গ্রহনের এবং কার্যসম্পাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক ভাবে  মানবতায় বিনিয়োগের  এবং মানবিক ও জরুরি উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য তহবিলে শূন্যস্থান হ্রাসের আহবান জানায় ।

এই শীর্ষ সম্মেলনটি  বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । এই দেশটি  প্রচন্ডভাবে জলবায়ু পরিবর্তন চ্যালেঞ্জ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে যা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে । এটা অনুমান করা যায় যে বাংলাদেশে  বাস্তুচ্যুত জনগনকে কার্যকরভাবে সহযোগিতা  প্রদানের চাপ প্রাথমিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল প্রভাবের  কারণে আগামী দিন গুলোতে বৃদ্ধি পাবে । উপরন্তু, বাংলাদেশ সত্তর দশকের  পর থেকে প্রতিবেশী মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা  মানুষদের আশ্রয় প্রদান করছে ।

আমরা এও জানি যে বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে উল্লেখযোগ্য দুইটি  ফল্ট-লাইন দেশটির উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব  স্থান দিয়ে চলে গেছে । শুধুমাত্র গত বছর বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন মাত্রার বেশ কয়েকটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হয়েছে  যা বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে । বিশেষজ্ঞরা  ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন  যে পার্শবর্তী রাষ্ট্রগুলোর মত যেকোনো  মুহূর্তে বাংলাদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প  আঘাত করতে পারে ।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বিভিন্ন সংস্কার এবং প্রতিরোধক নীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা থেকে নিহতদের সংখ্যা  কমিয়ে আনতে বেশ কিছুটা সক্ষম  হয়েছে । বাংলাদেশ সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল  দেশের  অভিজ্ঞতা ও সেরা পদ্ধতি অন্যান্যদের কাছে তুলে ধরার জন্য এই শীর্ষ সম্মেলন-এ  অংশগ্রহণের জন্য প্রেরণ করেছে । এটি আশা করা হচ্ছে যে নতুন বৈশ্বিক নীতি তৈরিতে সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে ইস্তাম্বুল সম্মেলনে বাংলাদেশ  একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে,  কেননা বাংলাদেশ বহু বছরের  মানবিকমূলক  চ্যালেঞ্জ গুলো সামলানোর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ধারণ করে ।

তাই, মানবিক-সংক্রান্ত বিষয় এবং সম্ভাব্য কোনো নতুন দুর্যোগের প্রস্তুতি গ্রহনের জন্য বাংলাদেশে জাতিসংঘের  সংস্থা, তহবিল  এবং  কর্মসূচি গুলো সরকার, সুশীল সমাজ এবং  উন্নয়ন সহযোগীদের  সঙ্গে তাদের বিভিন্ন চলতি কার্যক্রমের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে ঘনিষ্ট ভাবে কাজ করে যাচ্ছে ।